আরো ৫০ লাখ মানুষের রেশন কার্ড করা হবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা!

জেলা প্রতিনিধি | প্রকাশিত : ১৭ এপ্রিল ২০২০ , ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতির এই ক্রান্তি কালে আরো ৫০ লাখ মানুষ রেশন কার্ড পাবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে এক ভিডিও কনফারেন্সে এ কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫০ লাখ মানুষের জন্য রেশন কার্ড করা আছে, যারা ১০ টাকার চাল পায়, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আরো ৫০ লাখ মানুষের রেশন কার্ড করে দেব। যেহেতু সব কিছু এখন বন্ধ, অনেক মানুষের কষ্ট হচ্ছে। যারা দিনমজুর, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, ছোট ব্যবসায়ী, এমনকি নিম্নবিত্তদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমরা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। সবাইকে সহযোগিতা করব। মানুষের কাছে হাত পাততে পারে না যারা, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি।

দেশের এই সংকটময় সময়ে খাদ্য সহায়তার জন্য প্রকৃত অসহায় ও দুস্থদের তালিকা করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কারা দলের ভোটার, এই দেখে তালিকা করা যাবে না। আমরা চাই, যারা প্রকৃত অসহায়, তারা তালিকায় আসুক। আওয়ামী লীগ শুধু দলীয় রাজনীতি করে না, আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য রাজনীতি করে।’ ত্রাণ নিয়ে কোনো রকম অনিয়ম ও দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ার করে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে, যাতে যারা সত্যিকার দুস্থ এবং যাদের ঘরে খাবার নেই তাদের খুঁজে বের করা যায়।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কে কোন দল করল, কে কার পক্ষে, কে আমার পক্ষে না, কে আমার ভোটার, কে আমার ভোটার না, সেটা দেখার দরকার নাই। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বলব, কে ভোট দিল তা নয়, সবাইকেই জনগণ হিসেবে দেখে সেভাবে তালিকা করবেন। প্রশাসনের যাঁরা কাজ করবেন তাঁরাও এটা নজরদারিতে রাখবেন। একটি মানুষও যেন না খেয়ে কষ্ট না পায়। আল্লাহর রহমতে প্রচুর খাবার আছে।’

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে গতকাল ঢাকা বিভাগের ৯ জেলার স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি গৃহীত উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় কোথায় কী প্রয়োজন, সে সম্পর্কে জানতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চাহিদা অনুযায়ী তা পূরণে তাত্ক্ষণিক নির্দেশ দেন তিনি। তিনি অবসরে চলে যাওয়া চিকিৎসক ও নার্সদের কাজে লাগানোর বিষয়েও সংশ্লিষ্ট মহলকে পরামর্শ দেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ছাড়াও স্বাস্থ্য সেক্টরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন। সকাল ১০টায় এই কনফারেন্স শুরু হয়।

ঘরে বসে ইবাদত করুন : আসন্ন রমজান মাসে তারাবি নামাজ ঘরে পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সৌদি আরব মসজিদে সব নামাজ পড়া বন্ধ করে দিয়েছে, এমনকি তারা তারাবি নামাজ ঘরে পড়বে। এটি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ঘরে বসে ইবাদত করতে হবে। এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানান তিনি।

আরো পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অযথা মসজিদে গিয়ে কেউ সংক্রমিত হলে সে আরেকজনকে সংক্রমিত করবে। আপনারা নিজেরাও অন্যকে করবেন। সেটা কিন্তু করবেন না দয়া করে। এ বিষয়টা সবাই মেনে চলবেন, সেটাই আমরা চাই। আল্লাহকে ডাকতে হবে, এবাদত করতে হবে। আপনি আপনার মতো করে যত ডাকতে পারবেন আল্লাহ সেটাই কবুল করবেন।’ রমজানে পণ্য পরিবহন ও খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

মানুষকে অমানবিক না হওয়ার অনুরোধ : ভিডিও কনফারেন্সের শুরুতে করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে এক মহিলাকে তাঁর স্বামী ও সন্তানরা জঙ্গলে ফেলে আসার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। গত সোমবার টাঙ্গাইলের সখীপুরের এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হলে অমানুষে পরিণত হয়। একটা মা জ্বরে আক্রান্ত হলে তার সন্তানরা-স্বামী গিয়ে জঙ্গলে রেখে আসে। এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহ হলে পরীক্ষা করান, চিকিৎসা করান, যত্ন নিন। জীবন আল্লাহর হাতে। যে কেউ যেকোনো সময় মারা যেতে পারে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে কারো অমানবিক হওয়ার যৌক্তিকতা নেই। করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে মানুষকে ঘর থেকে বের করে দেবে, আক্রান্ত ডাক্তারকে এলাকাছাড়া করবে, এ রকম হতে পারে না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাস এমন এক আতঙ্ক, যা সারা বিশ্বে আগে দেখা যায়নি। কিন্তু এই ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব যেন একটা বিন্দুতে চলে এসেছে।’

অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা : প্রধানমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব মন্দা এমনকি দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করায় দেশের জনগণকে রক্ষায় তাঁর সরকার ইতিমধ্যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি করেছে। তিন অর্থবছর ধরে এটা কার্যকর হবে।

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস এমন একটা ব্যাপার, সারা বিশ্বে এ ধরনের ঘটনা আর কখনো দেখা যায়নি। সারা বিশ্বে ২৫০ কোটি মানুষ ঘরবন্দি। এটি একটি অদৃশ্য শক্তি, যা চোখে দেখা যায় না। এর প্রভাবে সারা বিশ্ব একটা জায়গায় চলে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘জীবন চালানোর জন্য কাজ করতে হবে, বসে থাকলে চলবে না। তবে ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিয়ে কাজ করবেন।‘

গরম পানি ও মৌসুমি ফল খাবেন : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষি উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিন। কৃষিকাজ খোলা মাঠে হয়। করোনাভাইরাসের ঝুঁকি কম। যাঁরা দিনমজুর তারা যানবাহন চলাচল শুরু হলে গ্রামে যাবেন, ধান কাটবেন। ফসল উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তবে জনসমাগম যাতে না হয়। খোলা মাঠে বড় জায়গায় যাতে হাট বসে। মাস্ক পরে যাবেন, বেচাকেনা করে চলে আসবেন। গরম পানি খাবেন, মৌসুমি ফলগুলো খাবেন।’

রাজধানীর পাশের এলাকায় আক্রান্ত বেশি : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোয় বেশি মানুষ আক্রান্ত। এ জেলাগুলোয় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ৭০ শতাংশ। সূচনা বক্তব্যের পর নারায়ণগঞ্জ জেলার সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, তাই এসব জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে আরো বেশি সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে, যাতে এই ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সারা দেশে ৬১ হাজার নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে। মাঝেমধ্যেই কিছু খবর আসে, যা দুঃখজনক। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আবার অনেক ক্ষেত্রে একজন আরেকজনকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে, যা কাম্য নয়। ত্রাণ যেন সঠিক লোকের হাতে পৌঁছায়, কোনো অনিয়ম যেন না হয়। অনেক সময় দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। তদন্তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে এ রকম কিছু ঘটেনি। কাজেই দুর্যোগের সময় কেউ কারো পেছনে লেগে থাকবে, এটা ঠিক না।

এ আঁধার কেটে যাবেই : শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বেই মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। আমরা যথেষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েছি, কিন্তু বিদেশে বাঙালিরা ততটা সুরক্ষা পায়নি। অনেক দেশেই অনেক বাঙালি মৃত্যুবরণ করেছে। এ আঁধার কেটে যাবেই। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় অবশ্যই সফল হব

মতামত
১৭ এপ্রিল ২০২০