কালিয়া ত্রাণ বিতরণের নানা অনিয়ম চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে

নড়াইল অফিস | প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০২০ , ৬:০৫ অপরাহ্ণ

সরকারী ত্রানে এলাকার নিজস্ব ভোটারদের দিয়ে পক্ষপাতিত্ব এবং দূর্নিতীর অভিযোগ উঠেছে নড়াইলের কালিয়ার পাচগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান জহুরুল হক মোল্যার বিরুদ্ধে। চেয়ারম্যানের পক্ষপাতিত্বের কারনে এলাকার দরিদ্র জেলে পরিবার, ভ্যানচালক আর গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা সরকারী ত্রান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সকল মানুষের অপরাধ এরা চেয়ারম্যান জহুরুল মোল্যাকে ভোট দেন না। ইউনিয়নের সকল ত্রান, নগদ টাকা দূর্নিতি আর স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিতরন হচ্ছে আত্মীয় আর নিজস্ব ভোটারদের মাঝে। এ নিয়ে ক্ষোভের শেষ নাই এলাকার মানুষের। চেয়ারম্যান এবং তার বাহিনীর কারনে দরিদ্র মানুষেরা কোথাও অভিযোগ করতে পারে না।

চেয়ারম্যান জহুরুল হক মোল্যা

চেয়ারম্যান জহুরুল হক মোল্যা

এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে সরকারী আড়াই হাজার টাকার নগদ সহায়তায় কারচুপি, ভিজিডিআর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর অনিয়ম। একই পরিবারের ৪জন / ৫জন করে, স্বামী-স্ত্রী, আপন দুই ভাই, মা-ছেলে, চিংড়ি ঘের মালিক, সম্পদশালী এভাবে নিজেদের লোকের নাম লেখিয়ে সরকারী অর্থ নয়-ছয় করছেন তিনি। ভিজিডি চাল বিতরনেও রয়েছে নানা অভিযোগ।

তানিয়া নামের এক গরীব নারীর ভিজিডির ৩০ কেজি চালে ভাগ বসাচ্ছে চেয়ারম্যানের ভাই সাবেক মেম্বর কালু মোল্যা। এসব বিষয়ে জানাজানি হবার পরে নানা কৌশলে আর মারধোর দিয়ে শায়েস্তা করা হচ্ছে প্রতিপক্ষ ভোটারদের। গত ৪ জুন কালু মেম্বরের হাতে মার খেয়েছেন রেজাউল বিশ্বাসের ছেলে শাকিল বিশ্বাস, এর আগে বাদশা মোল্যার ছেলে বাধন মোল্যা কে মেরেছে চেয়ারম্যানের ভাইপো সিহাব, জাহাঙ্গীর এর দল। ভুক্তভোগী রেজাউল বিশ্বাস এ ব্যাপারে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

সরকারী ২হাজার ৫’শ টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তার তালিকা খোজ করে দেখা গেছে প্রায় ৪০ জনের মোবাইল নম্বর দুই/তিনবার করে লেখা হয়েছে। মহিষখোলা গ্রামের শহিদুল মোল্যা (সিরিয়াল-৪৬৩) তার তিন ছেলে শফিকুল মোল্যা(২০৬), মুজিবর মোল্যা (২০৭) ও ফরিদ মোল্যার (২১৫) নাম রয়েছে। একই গ্রামের কাদের মোল্যা(১৮৫), তার স্ত্রী পিয়া বেগম(২০৩), আপন দুই ভাই আহাদুল মোল্যা(১৯১), মুনসুর মোল্যার(২০৯) নাম রয়েছে। হাসিনা বেগম(৪৩৯) ও তার দুই ছেলে ইমরুল শেখ (৪৪৪), কামরুল শেখ(৪৫৩) এর নাম রয়েছে। মহিষখোলা গ্রামের আপন দুই ভাই মহিদ শেখ(৪৫৭) ও ভুট্টো শেখের(৪৫৮) নাম রয়েছে তালিকায়। একই তালিকায় নাম রয়েছে সলেমান বিশ্বাসের দুই ছেলে মুক্ত বিশ্বাস(৪৫৪) ও ইক্তার বিশ্বাসের(৪৫৫)। এসকল সরকারী ত্রানের ক্ষেত্রেই ইউপি চেয়ারম্যান তার নিকট আত্মীয় অথবা নিজের পক্ষীয় ভোটারদের নাম অর্ন্তভুক্ত করেছেন।

এদিকে করোনা কালীল সময় থেকেই গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা সহ কয়েক হাজার জেলে ও নিম্নবিত্ত পরিবারের লোকজন কর্মহীন হয়ে পড়লেও তাদের কাছে সরকারী নানা ধরনের সুবিধাদি পৌছাচ্ছে না। স্থানীয় হতদরিদ্র মানুষদের অভিযোগ চেয়ারম্যান কেবলমাত্র তার নিজস্ব লোকজনদের মাঝেই সকল সুবিধা বিতরন করছেন।

যাদবপুর চৌরাস্তা এলাকায় ভ্যান চালায় অন্ততঃ ৩’শ জন। এদের অধিকাংশই সরকারী সহায়তার আওতায় আসেনি যাদবপুর গ্রামের ভ্যানচালক হাফিজুর বিশ্বাস, আনোয়ার বিশ্বাস, রফি শেখ,ইমরুল সহ কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সরকারী ত্রান, নগদ টাকা এগুলো আমরা পাইনা, আমাদের মতো গরীব লোককে না দিয়ে চেয়ারম্যানের পছন্দের লোকদের দিচ্ছে।

ভ্যানচালক ইমরুল বলেন, চেয়ারম্যান জহুরুল তার নিজের আত্মীয় স্বজনদের চাল, তেল, ডাল, সাবান দিয়েছে। আবার আড়াই হাজার টাকাও দিয়েছে। জহুর চেয়ারম্যানরে ভোট না দিলেও আমরা গরীব, সরকার তো আমাদের না দেবার জন্য বলেনি।

খোজ নিয়ে জানা গেছে পাটেশ্বরী গুচ্ছগ্রামে ৩০ পরিবারের অন্ততঃ দেড়শ মানুষের বাস। এদর মধ্যে কেউ বাজারে চটপটি বিক্রেতা, কেউ ট্রলারে কাজ করে আবার কেউবা ভ্যান চালায়। গুচ্ছগ্রামের প্রতিবন্ধী ইলিয়াস আলী, বিধবা রাহিলা বেগম বলেন, চেয়ারম্যান আমাদের দিকে কখনই তাকায় না। সরকারী যত সহায়তা আমরা পাইনা। শুনছি নগদ টাকা দিচ্ছে তাও দেয় না,এগুলো কাদের দেয় কোথায় যায়? আপনারা চেয়ারম্যানকে কিছু বলে আমাদের জন্য একটু ব্যবস্থা করে দেন।

কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস সূত্রে জানা গেছে, করোনা শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১০ দফায় সরকারীভাবে ২০ মেট্রিকটন চাল, নগদ ৬০ হাজার টাকা এবং ৪০ টি শিশুখাদ্য প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ৪৯৬ জনকে ২৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছে।

ইউপি চেয়ারম্যান জহুর মোল্যার চাচাতো ভাই বাদশা মোল্যা বলেন, চেয়ারম্যান এবং তার লোকেরা মুখ চিনে ত্রান দিচ্ছে যাকে একজন অনেক পাচ্ছে আর প্রকৃত দরিদ্র লোকেরা বঞ্চিত হচ্ছে। এটা অন্যায় এবং দূর্নিতী।

ইউপি চেয়ারম্যান জহুরুল হক মোল্যা বলেন, ত্রানের কোন তালিকাই আমি একা করিনা, সমস্ত মেম্বরদের নিয়ে করি। ব্যস্ততার কারনে ছোটখাট ভুলভ্রান্তি হতে পারে। আমি ত্রান কোন নিয়ে পক্ষপাতিত্ব করিনা। আমার কাছে সবাই সমান।

কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.নাজমুল হুদা বলেন, ত্রান সহায়তা দেবার তালিকা ইউপি চেয়ারম্যানই করে থাকে। এক্ষেত্রে দূর্নীতি হলেও সব কিছু ধরা সম্ভব হয়না। তবে নগদ টাকা সহায়তার কোন গড়মিল হলে তা ধরা পড়বে এবং সেভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দেশজুড়ে
১৬ জুন ২০২০