স্বাস্থ্য দুর্নীতির দুষ্টচক্রে এখন পর্যন্ত সাংবাদিকসহ ৩৫ জনের নামের তালিকা প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ , ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘকাল ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, কেনাকাটায় দুর্নীতির একটি বড় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় ঘিরে দুর্নীতির দুষ্টচক্রে এখন পর্যন্ত ৩৫ জনের নাম বেরিয়ে এসেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এই চক্রে স্বাচিপ ও বিএমএর একাধিক নেতা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আছেন। তালিকায় সাংবাদিকের নামও বাদ যায়নি। ওই সাংবাদিক একটি পত্রিকার সম্পাদক পদে নিযুক্ত। সরকারের সংশ্নিষ্ট সূত্রে স্বাস্থ্যের দুষ্টচক্রের এ তালিকা এসেছে।

একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঘিরে যারা অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছিলেন তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৫ জনের নামের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও মালেককে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে এই দুষ্টচক্রের খোঁজ মিলেছে। এই তালিকায় রয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তিনজন প্রধান সহকারী। তারা হলেন- সৈয়দ জালাল, জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার ও মো. জাকির হোসেন। তালিকায় আছেন হিসাবরক্ষক আতিকুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবির আহমেদ চৌধুরী, অফিস সহকারী ইকবাল হোসেন, এইডস শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহজাহান ফকির (ডিজির পিএ হিসেবে কর্মরত), প্রোগ্রামার (এমআইএস) রুহুল আমিন, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রশিক্ষণ ও মাঠ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম, চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের হেলথ এডুকেটর (প্রেষণে অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোতে) মো. জাকির হোসেন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ভবনের অফিস সহকারী তোফায়েল আহমেদ, কমিউনিটি ক্লিনিকের উচ্চমান সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন, ফাইভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ হেল কাফী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, শেরেবাংলা নগরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মাহামুদুজ্জামান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গুদাম কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা বিভাগীয় দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা দীপক কান্তি, খুলনার শেখ আবু নাসের হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জালাল মোল্লা, সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রধান সহকারী আসিক নেওয়াজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের হিসাবরক্ষক মো. মারুফ হোসেন, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গুদাম কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দিন, রাজশাহীর পরিচালক (স্বাস্থ্য) অধিদপ্তরের প্রধান সহকারী মো. হেলাল উদ্দিন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের গুদাম কর্মকর্তা মো. সাফায়েত হোসেন, খুলনার বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) অধিদপ্তরের স্টেনোগ্রাফার মো. ফরিদ উদ্দিন, একই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সহকারী মাহতাব হোসেন ও অফিস সহকারী জাহাঙ্গীর আলম। জাহাঙ্গীর পেনশনের কাজ করেন। এই তালিকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তিন মহাপরিচালক, স্বাচিপ ও বিএমএ নেতারাও রয়েছেন।
তালিকায় থাকা অনেকের বক্তব্য জানতে সমকালের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তাদের মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহজাহান ফকির সমকালকে বলেন, ‘আমি সম্মানের জন্য চাকরি করি; টাকা কামানোর জন্য চাকরি করি না। যদি অনিয়ম করি, সেটা তো গোপন থাকবে না।’ তালিকায় থাকা জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার মোবাইলে ফোন করলে তার স্ত্রী রিসিভ করে জানান, তার স্বামী নামাজ পড়ছেন। পরে একাধিকবার ফোন করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মালেকের নামে-বেনামে আরও কোথায় কী সম্পদ রয়েছে, সে তথ্য বের করতে বিভিন্ন সংস্থায় যোগাযোগ করা হচ্ছে। এ ছাড়া তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিও মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করতে পারে। মালেক প্রথম স্ত্রী নার্গিস আক্তারের নামে তুরাগের দক্ষিণ কামারপাড়ায় রমজান মার্কেটের উত্তর পাশে ছয় কাঠা জায়গার ওপর সাততলা দুটি আবাসিক ভবন তৈরি করেছেন, যার নাম ‘হাজী কমপ্লেক্স’। এ দুটি ভবনে ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর একটি ভবনের তৃতীয় তলার এক আলিশান ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি। বাকি ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেওয়া। কামারপাড়ার ওই বাড়ির আশপাশের বাসিন্দারা জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক মালেককে তারা ‘বাদল’ নামে চিনতেন। এলাকায় প্রভাব নিয়ে চলতেন তিনি। তার সন্তানরা দামি গাড়িতে চলাফেরা করতেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন গাড়িচালক তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কীভাবে এমন বিলাসী জীবনযাপন করছেন- এটা নিয়ে এলাকাবাসীর মনেও অনেক প্রশ্ন ছিল। এরই মধ্যে তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা মালেকের বাসায় একাধিক দফায় ঘুরে এসেছেন। তার ব্যাপারে আশপাশের লোকজনের কাছ থেকেও তথ্য নিচ্ছেন।
মালেক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তাদের আদি নিবাস কুমিল্লায়। তবে তার বাবা আবদুল বারী একসময় হাতিরপুল এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি বড়ও হয়েছেন সেখানে। মালেকের বাবা সচিবালয়ে পিয়ন পদে চাকরি করতেন। ছোটবেলা থেকেই মালেক দুষ্ট প্রকৃতির ছিলেন। তিনি ১৯৮২ সালে সাভারে একটি স্বাস্থ্য প্রকল্পে গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। দুই বছর পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলে তার চাকরি স্থায়ী হয়। এরপর তিনি প্রেষণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদপ্তরে গাড়িচালক হিসেবে বদলি হন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত কাগজে-কলমে সেখানেই তিনি গাড়িচালক ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক শাহ মনিরের আমলে মূলত তার উত্থান। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ডিজির গাড়ি চালাতেন তিনি। সর্বশেষ চালিয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েতের গাড়ি। এর আগে চালিয়েছেন সদ্য সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদের গাড়ি। দু’জনের সঙ্গে মালেকের সখ্য ছিল। এভাবেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিজের আধিপত্য ধরে রাখেন মালেক। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রে যুক্ত হয়ে লাখ লাখ টাকা অবৈধ পথে অর্জন করেন তিনি।
সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, মালেকের সূত্র ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ চক্রের আরও অনেকের নাম বেরিয়ে আসছে। মালেক ধরা পড়ার পর দুর্নীতি করে যারা কোটি কোটি টাকা কামিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন তারা এখন আতঙ্কে। দায়িত্বশীল অপর একটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতিবাজ চক্র ভেঙে দিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও র‌্যাব একসঙ্গে কাজ করবে।
চালক মালেকের বাবার মাজারও দখল করে নেওয়া জায়গায় : ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন ও আবু সালেহ মুসা টঙ্গী থেকে জানান, আবদুল বারী মাইজভাণ্ডারী মারা যাওয়ার দীর্ঘদিন পর সমাধি পাকা করা হয়। হঠাৎ সচিবালয়ের পিয়ন পদে চাকরি করা আবদুল বারীর কবরের ওপর তৈরি করা হয় পাকা স্থাপনা। তার ওপর মাঝখানে দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ। চারদিকে চারটি মিনার। এর সম্মুখভাগে লেখা রয়েছে ‘মাজার শরিফ :শাহ সুফি আলহাজ আবদুল বারী মাইজভাণ্ডারী’। টঙ্গীর কামারপাড়া এলাকায় এ ‘মাজার’টির অবস্থান। প্রয়াত এই আবদুল বারীর ছেলেই হলেন বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবদুল মালেক বাদল। অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা মালেকের বাবা মাইজভাণ্ডারীর মুরিদ ছিলেন। প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই বাজারে ভক্তরা আসত। মাঝেমধ্যে মালেকও আসতেন বাবার মাজারে। ২০০৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর মারা যান আবদুল বারী। বাবার কবরটিও নিজের কেনা জমিতে দেননি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এলাকাবাসী বলেন, জায়গাটি দখল করে মাজার বানানো হয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, হঠাৎ ওই এলাকায় আবদুল বারী মাইজভাণ্ডারী নামে ওই ব্যক্তির আগমন ঘটে। একটি ডেইরি ফার্ম ছিল সেখানে। মালেক তার ছেলে ইমনের নামে ফার্মটি গড়ে তোলেন। এটা দেখভাল করতেন আবদুল বারী। ওইখানেই তার মৃত্যু হয়। সেই ডেইরি ফার্মের এক কোনায় দাফন করা হয় বারীকে। পরে বাবার কবরকে ঘিরে মালেক তৈরি করেন সুদৃশ্য মাজারটি। যদিও এলাকাবাসী এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সরে দাঁড়ান এলাকাবাসী। কামারপাড়া এলাকার লোকজনের কাছে বারী তেমন পরিচিতই ছিলেন না। সরেজমিন দেখা যায়, ডেইরি ফার্মটি এখনও আছে। কর্মচারীরা কাজ করছেন। একজন জানান, মাজারে ভক্তরা বেশ টাকা-পয়সাও দেয়। সেই টাকা মাজার পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে খরচ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, মাজারে ভক্তদের দান করা টাকার একটা অংশ মালেকের কাছে যেত।

বাংলাদেশ
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০